অভিজ্ঞতার দাম – বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সংগ্রাম ও শেখার গল্প

Life Master VK
0

 

ঢাকার অলি-গলিতে হাজারো স্বপ্ন প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে। কেউ ডাক্তার হবে, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ অফিসার। আবার সেই স্বপ্নের সাথে লড়াই করছে বাস্তবতার কঠিন দেয়াল। এমনই এক তরুণ—আজিজ।

আজিজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষ করেছে। তার পরিবারের আশা ছিল—আজিজ একদিন সরকারি চাকরিতে ঢুকবে, আর তখন সংসারের কষ্টগুলো ধীরে ধীরে মুছে যাবে। মা সবসময় গর্ব করে বলতেন—
“আমার ছেলে একদিন বড় অফিসার হবে।”

কিন্তু জীবন কি এত সহজ?


📌 প্রথম ব্যর্থতা

আজিজ প্রথম চাকরির জন্য আবেদন করেছিল বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (BCS)। কয়েক মাস রাত-দিন পড়ে পরীক্ষায় অংশ নিলো। কিন্তু প্রথম ধাপেই বাদ পড়ে গেল।
তার মনে হলো— হয়তো প্রস্তুতি ভালো হয়নি। তাই আবার নতুন করে শুরু করলো।


পরিবর্তনের আলো

দ্বিতীয়বার আরও জোর দিয়ে চেষ্টা করলো। কিন্তু ফলাফল একই।
এবার পরিবার থেকে চাপ বাড়তে লাগল। বাবা রেগে বললেন—
“তুই সারাদিন বই নিয়ে পড়ে আছিস, কিন্তু ফল তো কিছুই আসছে না!”

মা আবার চোখ মুছতে মুছতে বললেন—
“চাকরি না হলে বিয়ে-শাদির কথাও কেমন করে বলবো!”

আজিজ ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছিল।


📌 ফেসবুকের প্রেরণা

একদিন রাতে হতাশ মনে আজিজ ফেসবুক স্ক্রল করছিল। হঠাৎ দেখলো—তারই এক বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু রফিক একটা পোস্ট দিয়েছে।
রফিক লিখেছে—
“আজ আমার ফুড ডেলিভারি কোম্পানির ১ বছর পূর্ণ হলো। এখন আমার সাথে কাজ করছে আরও ৪ জন ছেলে। সবাই মিলে চেষ্টা করছি নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়তে।”

ছবিতে দেখা গেলো, রফিক বাইক নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে, পেছনে আরও তিনজন ছেলেও আছে।

আজিজ প্রথমে ভাবলো—
“ইশ! ও তো ভালো স্টুডেন্ট ছিল, চাকরিটা না পেয়ে এরকম কাজ করছে?”


অন্ধকার থেকে আলোর পথে | বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের গল্প

কিন্তু ধীরে ধীরে মনে হলো—
“না, আসলেই তো ও বসে নেই। ওর আয়ের পথ আছে, সম্মানের পথ আছে।”


📌 পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত

সেই রাতে আজিজ ঘুমাতে পারলো না। বারবার মনে হতে লাগল— “চাকরি না পেলে কি জীবন থেমে যাবে? আমরা কি শুধু পরীক্ষার জন্য জন্মেছি?”

পরদিন সকালে আজিজ সাহস করে পরিবারের সাথে কথা বললো। সে জানালো—
“আমি একটা বাইক কিনবো। প্রথমে হয়তো ছোট কাজ হবে, কিন্তু আমি বসে থাকবো না।”

প্রথমে পরিবার অবাক হয়ে গেল। বিশেষ করে বাবা—
“তুই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করেছিস এইজন্য? বাইক চালাবি?”

কিন্তু আজিজ হাল ছাড়লো না। সে বুঝিয়ে বললো—
“বাবা, কাজ ছোট-বড় হয় না। শুধু কাজ ইজ্জত হারায় তখনই, যখন মানুষ বসে থেকে ভিক্ষা চায়।”

অবশেষে পরিবার রাজি হলো।


📌 নতুন পথচলা

আজিজ একটা সেকেন্ডহ্যান্ড বাইক কিনলো। ঢাকায় এক নামী ফুড ডেলিভারি অ্যাপে রেজিস্ট্রেশন করলো। প্রথম দিনেই কয়েকটা অর্ডার ডেলিভারি দিল। ছোট্ট একটা ব্যাগ নিয়ে সে সারা শহরে ছুটলো।

প্রথমে লোকে অবাক হয়ে তাকাতো—
“আজিজ! তুই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে, এই কাজ করছিস?”

কিন্তু সে কারও কথা শুনলো না।


শেষ আশা – এক গ্রামের ছেলের স্বপ্ন

এক মাসের মধ্যে সে ভালো রোজগার করতে শুরু করলো। যদিও কাজটা সহজ ছিল না—গরমে রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো, বৃষ্টিতে ভিজতে হতো, ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকতে হতো। তবুও তার মনে একটাই শান্তি—
“আমি নিজের পরিশ্রমে খাচ্ছি। কাউকে নিরাশ করছি না।”


📌 সমাজের মানসিকতা

আজিজ খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারলো—বাংলাদেশে একটা বড় সমস্যা হলো কাজকে ছোট করে দেখা
চাকরি পেলে সবাই গর্ব করে, অথচ ব্যবসা বা ফ্রিল্যান্স কাজকে কেউ কেউ হেয়ভাবে দেখে।

একদিন এক আত্মীয় এসে সরাসরি বললো—
“এই কাজ করে কি সংসার চলবে? চাকরিই কর, এভাবে সম্মান হবে না।”

তখন আজিজ শান্তভাবে উত্তর দিলো—
“চাকরি এখনো আমার লক্ষ্য। কিন্তু বসে থেকে সময় নষ্ট করার চেয়ে আমি কাজ করছি। অভিজ্ঞতা অর্জন করছি। অভিজ্ঞতার দাম সবসময় টাকায় মাপা যায় না।”


📌 সাফল্যের গল্প

ছয় মাসের মধ্যে আজিজ নিজের আয় থেকে আরও একটা বাইক কিনলো এবং তার এক বন্ধু শামীমকে সেই কাজে লাগালো। ধীরে ধীরে সে একটা ছোট ডেলিভারি টিম তৈরি করলো।

যে ছেলেটি একসময় চাকরি না পেয়ে হতাশায় কেঁদেছিল, সে এখন অন্যদের কাজের সুযোগ দিচ্ছে।

একদিন তার মা বললেন—
“বাবা, আমি ভুল বুঝেছিলাম। তুই যে কাজ করছিস, সেটা ছোট নয়। তোর পরিশ্রমে সংসার চলছে। তুই-ই আমাদের গর্ব।”

আজিজ চোখ মুছলো, মনে মনে বললো—
“সত্যিই, অভিজ্ঞতার দাম একদিন সবাই বুঝবে।”

📌 শেখার বিষয়

👉 চাকরি পাওয়া যাবে, আবার নাও পেতে পারে। কিন্তু জীবনের রাস্তা এখানেই শেষ নয়।
👉 ছোট কাজকে অবহেলা করা যাবে না।
👉 পরিশ্রম করলে যে কোনো কাজেই সম্মান পাওয়া যায়।
👉 অভিজ্ঞতা সবসময় সম্পদ হয়ে থাকে।

#বাংলাদেশ #গল্প #শিক্ষণীয়গল্প #তরুণসমাজ #চাকরি #পরিশ্রম #উদ্যোক্তা #লাইফস্টোরি #MotivationalStory #BangladeshYouth

Tags

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)
3/related/default